মেঘনায় ভরা মৌসুমেও পাওয়া যাচ্ছে না ইলিশ

ইউনুছ শিকদার (রামগতি) লক্ষীপুর: মেঘনা নদীবেষ্টিত রামগতি ও দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া। একসময় এ জনপদের খ্যাতি ছিল ইলিশের সাম্রাজ্য হিসেবে। রামগতি বাজার মাছ ঘাটের আড়তে দৈনিক কোটি টাকার ইলিশ বেচাকেনা হতো। কিন্তু সে ঘাটে এখন হাহাকার। আশ্বিনের শুরুতে মিলছে না কাঙ্খিত মাছ। ভরা মৌসুমে জোগান না থাকায় আড়তে ব্যবসায়ীরা হাত গুটিয়ে বসে থাকছেন। যে অল্প কিছু ইলিশ আসছে, তার দাম আকাশছোঁয়া। এক কেজি ওজনের ইলিশের দাম দেড় হাজার থেকে ২ হাজার টাকা।

কেনো ইলিশের এমন আকাল– এ নিয়ে কথা হয় বেশ কয়েকজন জেলের সঙ্গে। লক্ষীপুরের রামগতির মো: আলা উদ্দিন বিশু মেঘনায় মাছ ধরেন প্রায় ২০ বছর ধরে। অভিজ্ঞ এই জেলে বলেন, এ বছর কম বৃষ্টি হওয়ায় নদীতে পানির প্রবাহ কম। তাই ইলিশ সমুদ্র থেকে তার বিচরণ ক্ষেত্র পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না। আলা উদ্দিন বিশু ৫জনকে নিয়ে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে মাছ ধরেন। মার্চ-এপ্রিল টানা দুই মাস নিষেধাজ্ঞার পর ১ মে ইলিশ ধরা শুরু করেন তিনি। দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার পরও ইলিশ নেই জানিয়ে আলা উদ্দিন বিশু বলেন, প্রতিবার মাছ ধরতে যেতে নৌকা, তেল, ইঞ্জিন আর সহকারীদের খরচ মিলে ৩ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এখন যে হারে মাছ ধরা পড়ছে, তা বিক্রি করে পোষাচ্ছে না।

স্থানীয় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রামগতি ও হাতিয়া উপজেলার ছোট-বড় ৪১টি ঘাট থেকে মাছ শিকারে যান প্রায় অর্ধ লাখ জেলে। গত ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে মাছ ধরা শুরু করেছেন জেলেরা। এরই মধ্যে আগামী অক্টোবরে ইলিশের প্রজনন সময়ের জন্য আসছে আরও ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা।

বর্তমানে ইলিশের ভরা মৌসুম চললেও জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা না পড়ায় লোকসানে রয়েছেন তাঁরা। জেলেরা যা মাছ পাচ্ছেন, এর মধ্যে জাটকার সংখ্যাই বেশি। এতে এ বছর যে সময়টুকু আছে, তাতে আর তেমন মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে উল্লেখ করেন তারা।

ভরা মৌসুমে ইলিশ না পাওয়ায় শুধু জেলেরা নন, ব্যবসায়ীরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে জানান রামগতি ঘাটের আঁখি মৎস্য আড়তের মালিক মো: দুলাল বেপারী, প্রতিবেদক কে তিনি বলেন, যেসব নৌকার জেলেরা নদীতে ইলিশ ধরতেন, তাঁদের জালে ইলিশ ধরা পড়ছে না। তবে যাঁরা গভীর সমুদ্রে যাচ্ছেন, তাঁরা কিছু মাছ পাচ্ছেন। তবে নদীতে প্রচুর পরিমাণ পোয়া মাছ ধরা পড়ছে। এতে মিটবে না ইলিশের ক্ষতি। অনেকে ব্যবসাও গুটিয়ে ফেলেছেন।

গত বছরও মেঘনা নদীতে জাল ফেলে জেলেরা অনেক মাছ পেয়েছেন, যাতে খরচ পুষিয়ে লাভও হয়েছে। কিন্তু এবারের চিত্র উল্টো। নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। মাছ ধরতে গিয়ে প্রতিদিনই ইলিশ ছাড়া খালি হাতে ফিরছেন। কেন এমন হচ্ছে, জানতে চাইলে রামগতির জেলে আলাউদ্দিন বিশু বলেন, নদীর এ অংশে অনেক ডুবোচর জেগেছে। এতে ছোট নৌকা নিয়ে গভীর পানিতে গিয়ে মাছ শিকার করা সম্ভব হয় না। কারণ, ইলিশ গভীর জলের মাছ ডুবোচরের কারণে এখন মাছ এসব নদীতে আসে না।

রামগতি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: জসিম উদ্দিন বলেন, ইলিশ সমুদ্র থেকে বিভিন্ন নদ-নদীতে ভ্রমণ করে, কিন্তু যে চ্যানেল দিয়ে ইলিশ ভ্রমণ করে বা নদীতে আসে সে পথে পর্যাপ্ত পানি নেই।এটার কারণ হচ্ছে বঙ্গোপসাগরের মেঘনা মোহনায় পলি জমে অনেক ডুবোচরের সৃষ্টি হয়েছে। বেশ কিছুদিন আগ থেকে প্রতি বছরই ইলিশ ক্রমান্বয়ে একটু দেরিতে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও এটি হতে পারে। এ বছর মার্চ-এপ্রিলে বৃষ্টিই ছিল না। জলবায়ু পরিবর্তন, অনাবৃষ্টি, বর্জ্য থেকে পানিদূষণ, অভয়াশ্রমের প্রবেশপথ ভরাট হওয়ার কারণে ইলিশ হুমকিতে আছে।

তিনি আরো বলেন, সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে যদি ইলিশ কম ধরা পড়ে, তাহলে সেটি চিন্তার কারণ। বর্ষাকাল ইলিশের মৌসুম বলে ধরা হয় সাধারণভাবে। তার মানে বৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইলিশ ধরা পড়বে না। বৃষ্টিপাত শুরু হলে ইলিশ চলাচল শুরু করে। সে সময় নদী ও সাগরের মোহনা হয়ে প্রজনন ও খাবারের জন্য নদীতে চলে আসে। সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরে দুটি অমাবস্যা এবং পূর্ণিমা থাকবে। আশা করা যাচ্ছে সে সময় প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে।